শংকর বাবা তারাপীঠের শেষ সিদ্ধ পুরুষ জেনে নিন অজানা কথা

শংকর বাবা তারাপীঠের শেষ সিদ্ধ পুরুষ জেনে নিন অজানা কথা

তারাপীঠের শেষ সিদ্ধ পুরুষ শংকর বাবা জেনে নিন তার অজানা কথা

শংকর বাবা তারাপীঠ – বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধি লাভের পর তারাপীঠ মহাশ্মশানে অনেকদিন কোন সিদ্ধ-সাধকরা তারা সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। তবে বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে একজন সাধকের পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল। সাধক বামাক্ষ্যাপার পর এমন আত্মভোলা, নির্লোভ সাধক আর তারাপীঠে দেখা যায়নি। মনে হয় কোনো দিন দেখা যাবেও না আর। এই সহজ-সরল আত্মভোলা সাধক‌ই হলেন শংকর খ্যাপা বা শংকর বাবা।

শংকর বাবা তারাপীঠের শেষ সিদ্ধ পুরুষ জেনে নিন অজানা কথা

শংকর বাবা এবং তার জন্মের কাহিনী

তারাপীঠ মহাশ্মশানের পশ্চিম দিকে দ্বারকার কূলে গাছগাছালিতে ঘেরা অতি প্রাচীন গ্রাম কবিচন্দ্রপুর। এই গ্রামেই ১৯২৬ সালে সাধক শংকর শংকর বাবা ( শংকর ক্ষ্যাপা )জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল যোগীন দাস। যোগীন দাসের দুটি ছেলে নারায়ন আর শংকর এবং একটি মেয়ে ছিল। যোগেন পেশায় ছিলেন তন্তুবায়।

বিষয় সম্পত্তি বলতে বিশেষ কিছু তাঁর ছিল না। অভাব-অনটনের সংসার। ছোটবেলা থেকেই শংকর অন্যান্য ছেলেদের হতে ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। তার সমবয়সী ছেলেরা যখন ছুটোছুটি করে খেলায় মত্ত থাকে শংকর তখন গ্রামের নির্জন জঙ্গলে একা একাই ঘুরে বেড়ায়, মাঝে মাঝে জঙ্গলের মধ্যে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে যায়! তখন আর নাওয়া-খাওয়ার খেয়াল থাকে না তার! আত্মভোলা শংকরের ( শংকর বাবা ) কোনরকমে গ্রামের পাঠশালায় অক্ষর পরিচয়টা হয়েছিল। পড়াশোনায় তার তেমন মন বসেনা, সারাদিনই গ্রামের নির্জন জঙ্গলের মধ্যেই সময় কেটে যায়!

 

শোনা যায় ঐ গ্রামের কোনো এক পুকুরের ধারে একটা তালগাছ ছিল, সেখানে গভীর রাতে মাঝে মাঝেই ধপ ধপ করে তাল পড়তো কিন্তু মানুষজন তাল কুড়োতে গেলে দেখতো, একটাও তাল পড়ে নেই! এরপর থেকে গ্রামে প্রবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে ওই তালগাছে ভূত বাস করে! সেই থেকে সন্ধ্যার পরে ওই পুকুরের পাড়ে তালগাছটির কাছে আর কেউ যেতো না। যাওয়ার সাহস‌ও করতো না। ছোটরা তো বটেই, বড়রাও যেতে সাহস করতো না!

 

শংকর বাবা কিন্তু বাল্যকাল থেকে এইসব ঘটনাকে আদৌ পাত্তা দিতো না। গভীর রাতে সে একাই চলে যেতো পুকুরের পাড়ের তাল গাছে তাল কুড়োতে! বালক শঙ্করের এইরূপ সাহস দেখে গ্রামের সকলে অবাক হয়ে যেতো!

মাঝে মাঝে শংকর বাবা তার দাদার সাথে গরুর ঘাস কাটতে মাঠে যেতো এবং গরু চরাতেও যেতো। তবে, সংসারের কাজে মন বসতো না শঙ্করের। তাই সে সময় পেলেই চলে যেত মাঠের ধারে জঙ্গলের মধ্যে “জটাধারীতলায়”! জটাধারী তলার বেল গাছের নিচে বসে সে একমনে ধ্যান করতো! ধ্যানের গভীরের তন্ময়তায় ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেতো তার! দিনদিন শংকর বাবা এইরূপ আচরণের মাত্রা বাড়তে থাকলো।

এখন থেকে সন্ধ্যার দিকেই সে জঙ্গলের মধ্যে জটাধারীতলায় বেল গাছের নিচে এসে ধ্যানস্থ হয়ে বসে থাকে! বাড়ির লোকেরা সন্ধ্যার সময় আসা আটকে দিলে, সে গভীর রাতে বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়লেও চলে আসে জটাধারীতলায়!

শংকর বাবা তারাপীঠের শেষ সিদ্ধ পুরুষ জেনে নিন অজানা কথা

প্রসঙ্গত উল্লেখ থাকে যে গ্রামের এই জটাধারীতলাটি নিয়ে ওই গ্রামে তখন নানান কাহিনী চালু ছিল। যেমন — ‘এখানে বেলগাছে ব্রহ্মদত্ত বাস করে! গ্রামের মাতব্বরদের মধ্যে অনেকেই নাকি তা প্রত্যক্ষ করেছিল! নিশীথ রাতে কে যেন ব্রহ্মচারীর বেশে অর্থাৎ মাথা ন্যাড়া, আদুল গা, কৌপীন পড়া, কাঁধে যজ্ঞ পৈতা, এক হাতে কমন্ডলু অন্য হাতে দন্ড, খড়ম পায়ে বেলগাছ থেকে নেমে জলের উপর দিয়ে হেঁটে দ্বারকা নদী পেরিয়ে শ্মশানের দিকে চলে যায়!

 

তাছাড়া প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামের এই জটাধারীতলার মাহাত্ম্য এখানকার মানুষজনের মুখে মুখে প্রচারিত হতে হয়ে আসছিল! বৃষ্টি হতে দেরী হলে বা বৃষ্টির সময়মতো না হলে, বর্ষার সময় গ্রামবাসীরা এই জটাধারীতলায় যজ্ঞাহুতিসহ পুজো দিয়ে জল বন্দনা কোরতো এবং তাতেই বৃষ্টি হোতো। এমন প্রবাদ‌ও আছে যে, এখানে পুজো করে বাড়ি ফেরার পথেই বৃষ্টি নেমেছে! সেই প্রাচীন কাল থেকেই এখানে যজ্ঞাহুতি দিয়ে জল বন্দনা করা হত।

২০২২ সাল মেষ রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( মেষ রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল বৃষ রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( বৃষ রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল মিথুন রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( মিথুন রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল কর্কট রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( কর্কট রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল সিংহ রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( সিংহ রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল কন্যা রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( কন্যা রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল তুলা রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( তুলা রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল বৃশ্চিক রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( বৃশ্চিক রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল ধনু রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( ধনু রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল মকর রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( মকর রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল কুম্ভ রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( কুম্ভ রাশিফল ২০২২ সাল )

 

২০২২ সাল মীন রাশির কেমন যাবে জেনে নিন এই লিঙ্কটি ওপেন করে ( মীন রাশিফল ২০২২ সাল )

 

যাইহোক, গ্রামের সকলের মনে একটা ধারনা শিকড় গেড়ে বসে ছিল যে, ওই জটাধারীতলায় বেলগাছে ব্রহ্মদৈত্য বাস করে তাই অন্ধকার নামলে এদিকে কেউ বড় একটা চলাফেরা করতো না, অথচ বালক শংকর ( শংকর বাবা ) গভীর রাতে একাকী এখানেই ধ্যান করতে আসতো। গ্রামের মানুষজন তখন বলাবলি করতে শুরু করল যে, শংকর পাগল হয়ে গেছে! গ্রামের মাতব্বররা বলাবলি কোরতে লাগলো, — ‘শংকরকে ভূতে পেয়েছে, তাকে নিশিতে টেনে নিয়ে যায় ইত্যাদি!

 

তারা শংকরের ( শংকর বাবা ) পিতা যোগীন দাসকে বললো —

“ভাল করে ছেলেকে ওঝা দেখাও! ঝার-ফুঁক দিলে ওর মাথা থেকে ভুত নেমে যাবে!” ওঝাও আনা হোল ! শংকর বাবা কে আষ্টেপৃষ্ঠে ঝাঁটা মেরে সেই ওঝা তার মাথা থেকে ভুত নামাবার চেষ্টা করতে গিয়ে, তাকে মেরে মেরে একেবারে বেহুঁশ করে ফেলল।

শংকর বাবা তারাপীঠের শেষ সিদ্ধ পুরুষ জেনে নিন অজানা কথা

এই অত্যাচারের ফলে শংকর জ্বরে পড়ে গেল! জ্বরের ঘোরে সে শুধু “তারা মা” “তারা মা” বলে কাঁদে ! কিছুদিনের মধ্যেই সে সুস্থ হোল কিন্তু তার পূর্বের আচরণে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হলো না। পিতা যোগীন দাস এর পরে বোধহয় তার ছেলের জীবনের রহস্য কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পুনরায় গ্রামের মাতব্বরদের কথায় ওঝা না দেখিয়ে শঙ্করের কাজকর্মে আর বাধা দেয়নি।

আত্মভোলা শংকরের পার্থিব কোন কিছুর উপরে যেন কোনো আকর্ষণ তার ছিল না ! কেউ ভাবতে পারতো না শংকর ভগবানের সাধনা করতে নির্জন জঙ্গলে যায়! এইটুকু ছেলে সাধনার বোঝেই বা কি ! তাই গ্রামের সকলে তাকে “শংকর ক্ষ্যাপা” বলেই ডাকতে লাগল।

 

এইভাবে বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেল। ইতিমধ্যে শংকর তার বাবা-মাকে হারিয়েছে ! সে এখন তার দাদা বৌদির আশ্রয়ে থাকে। যদিও বৌদি তাকে মায়ের মত স্নেহ ও যত্ন কোরতো, দাদা নারায়ন শংকরকে শাসন করার সুরে কিছু বলতো না! কোনদিন মাঝে মাঝে বলতো — “শংকর! তুই বড় হয়েছিস, এবার আমাকে সংসারের কাজে একটু সাহায্য কর! শুধু জঙ্গলে বসে থাকলেই কি পেট ভরবে?” কিন্তু সংসারের কথা শুনতে ভালো লাগতো না তার!! তার যখন খেয়াল হোতো, তখন সে মাঠে গরু চরাতে যেতো মাঝে মাঝে গরুর জন্য ঘাস কেটে আনতো! তবে, বেশিরভাগ সময়ে সে গ্রামের নির্জন জঙ্গলে জটাধারীতলাকে কেন্দ্র করেই সময় কাটাতো! শোনা যায় শঙ্করের যখন ১৫ বছর বয়স তখন তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এক ধরনের বিষাক্ত ঘা হয়েছিল।

 

তার দাদা প্রথমে কবিরাজি চিকিৎসা করেন কিন্তু তাতে কোনো ফল হলো না দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করেও সব‌ই নিস্ফল হোলো। শঙ্করের শরীরে ঘা-এর প্রকোপ ক্রমশঃ বেড়েই যেতে থাকলো। তখন সাধ্যমত এলোপ্যাথিক চিকিৎসা করানো হোলো কিন্তু তাতেও ঘাগুলো না সেরে বরং সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল। ঘায়ের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উঠল শংকর! যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না, রাতের পর রাত তাকে জেগে কাটাতে হয়! তার আপনজনেরাও অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। শংকর কখনো “তারা মা” ” তারা মা” করে কেঁদে ওঠে, আবার কখনো “বড়দা” “বড়দা”( সাধক বামাক্ষ্যাপাকে শংকর ‘বড়দা’ নামেই সম্বোধন করতেন) বলে কাঁদে! অনেকের মুখে শুনেছিল সে__ যে, এই ঘা সারবার নয়!

 

সেই অবস্থায় কেউ তাকে সহ্য করতে পারতোনা রাতদিন শুধু গঞ্জনা শুনতে হতো! চারদিকে শুধু গঞ্জনা আর সেই ঘায়ের অসহ্য যন্ত্রণা –শঙ্করের জীবন যেন দুর্বিষহ হয়ে উঠল! সে শুধু চোখের জল ফেলে, আর বলে — “তারা মা, আমাকে ভালো করে দাও! তারা মা, আমাকে ভালো করে দাও!”

ইতিমধ্যে তখন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ! তৎকালীন বাংলার লীগ মন্ত্রিসভা সৈন্যবাহিনীর জন্য খাদ্য সংগ্রহের নীতি গ্রহণ করলে ব্যবসায়ীরা মুনাফার লোভে সৃষ্টি করলো কালোবাজারি! সূচনা হল বাংলার বুকে দুর্ভিক্ষের দাপাদাপি! যার ফলে হয়েছিল ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ ! সেই সময় একে তো মানুষ দুবেলা দুমুঠো পেটপুরে খেতে পেতো না তার ওপরে লাগলো মড়ক! মড়কে গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বিনা চিকিৎসায় মরতে শুরু করলো।

 

একে তো শঙ্করের শরীরকে ওই বিষাক্ত ঘা দুর্বল করে দিয়েছিল, তার উপরে তার কলেরা শুরু হয়ে গেলো। ফলে ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ল শংকর এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা মনে করলো শংকর মারা গেছে! হরি ধ্বনি দিতে দিতে প্রতিবেশীরা সেই মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে হাজির হোল তারাপীঠ মহাশ্মশানে! বর্ষণমুখর সন্ধ্যা, সহযাত্রী দল শ্মশানে আসতেই শুরু হলো বৃষ্টি ! তারা শংকরের মৃতদেহ শ্মশানের এক প্রান্তে রেখে মৃতদেহ বহনকারীদের রাত্রিবাসের জন্য যে জায়গা আছে সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি গভীর হলো, কিন্তু বৃষ্টি থামলো না! এমন সময় অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটে গেল মরার খাটিয়া থেকে শংকর হুড়মুড় করে উঠে বসে পড়লো! সহযাত্রীরা “ভূত” “ভূত” চিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পারলো ছুটে পালালো!

 

পরদিন অনেকে মিলে জুটেপুটে এসে গ্রামবাসীরা দেখল শংকর তার জন্যে সাজানো চিতার পাশে বসে আছে। সেই দিন থেকেই শংকর স্থির করে নিল যে, সে এখন থেকে শ্মশানবাসী হবে। তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর। দীর্ঘ রোগভোগের কারণে অসুস্থ দেহেই সে সেখানে থাকতে লাগলো। সেই সময় তারাপীঠ মহাশ্মশান এখনকার মতো মুখরিত ছিল না ! এই শ্মশান এত গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল যে, দিনের আলোই সেখানে ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারতো না। দিনের বেলাতেই মানুষজন একা একা ঢুকতে ভয় পেতো! দিবানিশি শবদেহ নিয়ে শেয়াল-কুকুরে টানাটানি চলতো, সন্ধে হোতে না হোতেই সারা শ্মশান শিয়াল কুকুরের ডাকে মুখরিত হয়ে উঠতো, গাছে গাছে চিল শকুনের বাচ্চারা এমনভাবে কাঁদতো যেন মনে হোতো কোনো মরা শিশুর প্রেতাত্মা কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছে !

 

এই পবিত্র শ্মশানভূমি যেন ডাকিনী-যোগিনীর বীভৎস তান্ডবলীলার নৃত্যমন্ডপে পরিণত হোত।

এ হেন শ্মশানে শ্মশানচারী শংকর ক্ষ্যাপা বেশিরভাগ সময়ই সাধক বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধাসন অর্থাৎ শিমুলতলায় পঞ্চমুন্ডির আসনের কাছাকাছি জায়গায় ঘুরে বেড়াতো! এমনকি রাত্রে ওই পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনাও করতো শংকর! ওখানে ঐ পঞ্চমুন্ডির আসনের উপরে শিশুর মতো ঘুমিয়েও পড়তো সে! এই রকমই চলছিল শংকরের সাধন-জীবন!

 

কথিত আছে যে, এই সময় থেকেই শংকর ক্ষ্যাপার জীবনে চরম পরিবর্তন ঘটে যায়! শ্মশানচারী শংকর ভয়ংকর শ্মশানের মধ্যে “তারা মা” “তারা মা” বলতে বলতে ঘুরে বেড়াতো! সবসময় যেন ‘তারামা’কেই জীবনের সার করে নিয়েছে সে! কিছুদিনের মধ্যেই তার শরীরের ঘা-গুলি শুকিয়ে যেতে লাগলো ! ধীরে ধীরে রোগ মুক্ত হয়ে গেল শংকর ! শরীরের কোথাও ঘায়ের একটা চিহ্ন‌ও আর দেখা যায় না ! তার রুগ্ন জীর্ণ চেহারাই এখন আর নাই, সে এখন রীতিমত বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী!

 

দীর্ঘকাল যে ঘা-এর জন্য এত কষ্ট সে ভোগ করলো, যাকে মড়ক-জনিত কারণে মৃত বলে শ্মশানে ফেলে দিয়ে আসা হয়েছিল__ সেই শংকর কোন্ মন্ত্রবলে কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠল — এই প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিলো কৌতুহলীদের মনে! তবে, সেদিন তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মায়ের প্রতি গভীর বিশ্বাস আর ভক্তির জোরেই শংকর তার জীবন ফিরে পেয়েছিল।

 

শ্মশানচারী শংকরের জীবন কি করে কাটে, সে শ্মশানে কি করে এবং খায়ই বা কি এসবের খবর তখন কেউ রাখতো না। সকল মানুষ তাকে ‘পাগল’ বলেই জানতো! একজন পাগল মানুষের জন্য কে আর মাথা ঘামায়? তবে, একথা অনেকেই জানতো যে, শংকর সবসময় মুখে শুধু “তারা মা” “তারা মা” করেই মহাশ্মশানে ঘুরে বেড়ায় এবং বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধাসন এর কাছাকাছি জায়গায় বেশিভাগ সময় কাটায়।

 

সে শ্মশানের বাইরে অর্থাৎ লোকালয়ের মধ্যেও মাঝে মাঝে আসতো। সেই সময় অনেকেই লক্ষ্য করতো যে, সে গরুর “পা-ওট” অর্থাৎ গরুর খুড়ে গর্ত হয়ে যাওয়া জায়গায় যে জলটুকু জমতো সেটি সে হামাগুড়ি দিয়ে পান কোরতো! এই দেখে সকলে ভেবে নিয়েছিল যে শংকর পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে শংকর লোকালয়ে আসতো ঠিকই কিন্তু সে কারো কাছে কখনো ভিক্ষা করেছে তা জানা যায়নি! তবে, শ্মশানের সেই নির্জন প্রান্তরে সে খায়ই বা কি, আর করেই বা কি এই নিয়ে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের সীমা ছিল না! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহাশ্মশানের সাধকের কাছে স্বর্গ আর সাধারণের কাছে প্রেতপুরী! তারাপীঠে তখন তেমন যাত্রী সমাগম হোতো না, মাঝে মাঝে আশেপাশের গ্রাম থেকে দু-চার জন যাত্রী মায়ের পুজো দিতে আসতো ঠিকই কিন্তু তার সংখ্যা অতি নগণ্য! দূরদূরান্তের ভক্তের সংখ্যা হাতে গোনার মতো! সে সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল ছিলনা বলেই হয়তো তারাপীঠে ভক্তের সমাগম ঘটতো না।

 

এমতাবস্থায় শংকর কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করতো তা সত্যিই রহস্যাবৃত থেকে গিয়েছিলো সাধারণ মানুষের কাছে! তবে তারাপীঠ মহাশ্মশানের শ্মশানচারী শংকর মাঝে মাঝে তার বোনের বাড়ি ‘কৌড়বেলে’ গ্রামে তেতো। তারাপীঠ থেকে মাত্র মাইল দূয়েক দূরে এই গ্রামটি। বোনের বাড়ীতে সে কিন্তু বিশেষ খাওয়া-দাওয়া করতো না, কিছুক্ষণ থেকেই চলে আসতো। মাঝে মাঝে তার ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে আসতো তারাপীঠে! ভাগ্নের নাম মানিক, আদর করে শংকর ডাকতো ‘মানকে’- বলে! ভাগ্নেকে কাঁধে তুলে নিয়ে পথ চলতে চলতে বারবার শংকরই তারা মায়ের নাম করতো, আর মাঝে মাঝে রামপ্রসাদী গান গাইতো – “সকলি তোমারি ইচ্ছা- ইচ্ছাময়ী তারা তুমি” অথবা “এমন দিন কবে হবে তারা, যবে তারা তারা তারা বলে ‘তারা’ বেয়ে পড়বে ধারা!” কখনো কখনো শংকর ভাগ্নেকে বলতো বড়দার কথা অর্থাৎ বামাক্ষ্যাপার কথা!

 

কিভাবে শিয়াল কুকুরের সঙ্গে একই পাতে আহার করতো

কিভাবে ভক্তের অনুরোধে বামা কঠিন কঠিন রোগ সারিয়ে ফেলতো সেই সব কথা! আরো শোনাতো কিভাবে বন্যাপ্লাবিত দ্বারকায় ঝাঁপ দিয়ে তার মায়ের শবদেহ শ্মশানে নিয়ে এসে তাঁর সৎকার করেছিলেন এবং মায়ের শ্রাদ্ধের দিন গন্ডী টেনে কিভাবে বৃষ্টি বন্ধ করেছিলেন সেই সব কাহিনী!

বামদেবের প্রতি শঙ্করের যেমন ছিল শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস, তেমনই ছিল গভীর ভক্তি। সাধক বামাক্ষ্যাপার প্রভাব ষোল আনাই শংকরের জীবনে বর্তেছিল! তাই গ্রামের সাধারণ ছেলে ‘শংকর’ ত্যাগ, বৈরাগ্য এবং সুতীব্র সাধনার দ্বারা হয়ে উঠলেন “মহাসাধক শংকর বাবা”! তারা মায়ের কৃপাধন্য ! [এখন থেকে শংকর বাবার ক্ষেত্রে সম্মানসূচক শব্দ‌ই ব্যবহার করা হবে।]

 

শংকর বাবা সম্পূর্ণরূপে সাধারণের কাছ থেকে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখেছিলেন অর্থাৎ তিনি যে একজন প্রকৃত সাধক বা তারা মায়ের কৃপাধন্য হয়েছেন এ কথার প্রকাশ ঘটাতে চান নি! সবার চোখেই শংকর ছিলেন “শংকর ক্ষ্যাপা”!

 

কিন্তু হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনায় সবাই জানতে পেরেছিল যে, এ পাগল — যে-সে পাগল নয়, এ পাগল ঈশ্বরের শক্তিতে শক্তিমান একজন মহাসাধক! ঘটনাটি নিম্নরূপ :-

সেই সময় কৃষকেরা ধানক্ষেতে ‘ফলিডল’ নামে এক ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ কোরতো। একদিন ঐ বিষ ছড়িয়ে ক্ষেতের মালিক নিয়মাফিক লাল পতাকা টাঙিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল! শংকর ঐ ক্ষেতের ধারে কাছে ঘোরাফেরা করছিলেন, হঠাৎ তিনি এ জমির কাছে এসে কোনো কিছু ভ্রুক্ষেপ না করে হামাগুড়ি দিয়ে ক্ষেতের জল পেট ভরে খেয়ে ফেললেন।

 

কতকগুলি লোক ওই ক্ষেতের কাছেই কাজ করছিল। তারা ওনাকে ঐ কাজ করতে দেখেই চিৎকার করে বারণ করছিল কিন্তু সেদিকে শঙ্করের কোন ভ্রুক্ষেপই ছিলনা ! প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে ফলিডল বিষ_ তখনকার দিনে খুবই মারাত্মক ছিল বলেই ভারত সরকার এই বিষ উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ করে দিয়েছে ! এই বিষ এতই মারাত্মক ছিল যে, বিষের খালি শিশি পুকুরের জলে ফেলে দিলেও পুকুরের সমস্ত জীব মারা যেতো। আর এই হেন মারাত্মক বিষ দেওয়া জল খেয়েছে শংকর সকলে ভাবলো আর ক্ষ্যাপার রক্ষা নাই! এবার ক্ষ্যাপা নিশ্চয়ই মারা যাবে ! ওখানে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের চোখের সামনে এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল বলে তারা আফসোস করতে লাগল এবং বিবেকের দংশন ভোগ করতে লাগলো । কিন্তু বিষের জ্বালায় ঢলে পড়লো না ক্ষ্যাপা সে দিব্যি নিশ্চিন্তে “তারা মা”_ “তারা মা” করতে লাগলো ! তার শরীর যেমনটি ছিল তেমনটিই রয়ে গেল ! মানুষজন যারা ওখানে ছিল তারা ভাবতে শুরু করলো‘ এ কী করে সম্ভব? যে বিষ-দেওয়া ক্ষেতের জল খেলে গরু-বাছুর পর্যন্ত মরে যায় __সেই মারাত্মক বিষ হজম করে দিল শংকর ক্ষ্যাপা? এই প্রশ্ন‌ই এরপর থেকে সবার মুখে মুখে ফিরতে লাগলো।

 

আর একদিনের একটা ঘটনা! সেদিন শংকরকে মারাত্মকভাবে রাস্তার কুকুর কামড়ালো! চরম রক্তপাত পর্যন্ত ঘটে গেল সকলেই ভাবল জলাতঙ্ক রোগের হাত থেকে শংকরের রেহাই নেই কিন্তু এবারও তার কিছুই হলো না ! দিব্যি নিশ্চিন্তে “জয় তারা মা” “জয় তারা মা” নাম করতে থাকে এবং সুস্থ শরীরেই বর্তমান থাকে। খ্যাপার এই ধরনের আচরণে মানুষজনের কৌতূহল তার প্রতি আরো বেড়ে গেল, তারা বুঝলো যে মা তারা-ই এই ক্ষ্যাপাকে রক্ষা করে চলেছেন! ছোটবেলা থেকেই যে অদৃশ্য শক্তির বলে শঙ্করের জীবনে ভোগের কোনোদিন কোনো বাসনা হয়নি এবং ছোট থেকেই তীব্র বৈরাগ্য জন্মেছিল, তারা মায়ের প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস জন্মেছিল সেই শক্তিই শংকরকে বার বার রক্ষা কোরতো।

 

একদিন শংকরকে দেখা গেল রাস্তার মোরামের ধুলোবালি মুঠো মুঠো করে ভক্ষন করছেন! তাঁর এরূপ কান্ড দেখে সকলে অবাক! কৌতূহল বেড়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীদের কয়েকজন শংকরের কার্যকলাপ অনুসরণ করতে মনস্থ করে! দু’এক দিন তাঁকে follow করে তারা বুঝতে পারে যে, শংকর প্রতিদিন‌ই মোরাম ভক্ষণ করে! প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে অনেকেই ভাবতে থাকে তাহলে কি শংকর শ্মশানবাসী হয়ে এতগুলো বছর মোরাম-মাটি খেয়েই জীবন যাপন করছে?

 

শংকর সেই ছেলেবেলা থেকেই নিজেকে মা তারার চরণে সঁপে দিয়েছিলেন বলেই তারা মায়ের আশীর্বাদে রাস্তার ধুলোই তাঁর কাছে পুষ্টিদায়ক খাদ্যে পরিণত হয়েছিল, আর তাই এই খাদ্য‌ই তাঁর এতদিনকার ক্ষুন্নিবৃত্তি করেছে, তাঁর শরীরে পুষ্টি যুগিয়েছে! এখন তিনি সবার কাছে সিদ্ধ সাধক শংকর খ্যাপা বা অনেকের কাছেই তখন তিনি “শংকর বাবা”! বৈচিত্রে ভরা তাঁর জীবন! জীবনের বেশিরভাগ সময় তাঁর কেটেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে ভয়ংকর শ্মশানের মধ্যে ! তাই অজ্ঞাত তাঁর সাধক জীবন ! অজানা তাঁর সাধন পদ্ধতি ! মানুষের সামনে যখন তিনি এসেছেন তখন মানুষ দেখেছে যে, মান-অপমান, শত্রু-মিত্র সবই তাঁর কাছে সমান বলে বিবেচিত হয়েছে! তাঁর কাছে প্রিয়-অপ্রিয়, সুখ-দুঃখ, উচ্চ-নিচ, ছোট-বড়, সাধু-অসাধু ইত্যাদির কোনো ভেদ ছিল না! তিনি ছিলেন সর্বত্যাগী, অহংকারশুন্য, নিরাসক্ত সাধক। তিনি যেন বৈরাগ্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছিলেন শুধুমাত্র তারা মায়ের প্রতি ভক্তি আর বিশ্বাসের জোরে!

 

শংকর সবসময় মানুষজন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন! এ স্বভাব ছিল তাঁর ছেলেবেলা থেকেই! নির্জনে তিনি শুধু তারা মায়ের নাম জপ করতেন ! “জপাৎ সিদ্ধি”_এই সত্যকে উপলব্ধি করেছিলেন শংকর। জপ করতে করতে শংকর কাপড়ে প্রস্রাব পায়খানা করে ফেলতেন। শুচি হয়ে জপ করা যায় আর অশুচি হয়ে জপ করা যায় না ! এই কথা ভুল প্রমাণ করেছিলেন শংকর ! দেহ-মন-আত্মা যেন তারা নামের নদীতে নিমজ্জিত ! তারা-ময় জীবন ছিল তাঁর!

 

সেদিন ছিল শনিবার ! অমাবস্যার রাত্রি ! কয়েকজন ভক্তের ইচ্ছা হোল তারা শংকর ক্ষ্যাপার সঙ্গে শ্মশানে যাবে। ক্ষ্যাপা শ্মশানে কি করে এটাই তাদের দেখার ইচ্ছা ! কিন্তু ক্ষ্যাপা কিছুতেই রাজি নয় ভক্তরাও নাছোড়-বান্দা, তারা যাবেই! কোনো উপায় না দেখে শংকর সেই ভক্তদের লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়তে লাগলেন ! তবুও একসময় ক্ষ্যাপা শ্মশানে প্রবেশ করলে ভক্তরাও চুপিসারে এসে তাঁকে লক্ষ্য করতে থাকে! গভীর রাত্রি ! শ্মশান তো নয় যেন রহস্যময় প্রেতপুরী ! ক্ষ্যাপা পঞ্চমুন্ডির আসনের কাছাকাছি জায়গায় আসতেই ভক্তদের কানে এলো মেঘের গর্জন ! ফাঁকা আকাশে কর্-কর্ আওয়াজে বজ্রপাত হোতে শুরু করলো, মরা শিশুর কান্নার শব্দে এবং নারী কন্ঠের বিকট হাসিতে যেন আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হয়ে গেল ! কৌতুহলী ভক্তের দল যে যেদিকে পারলো ছুটে পালালো ! শঙ্করের সাধনার কোনো বিঘ্ন ঘটলো না !

 

তারাপীঠ মহাশ্মশানের শংকর ক্ষ্যাপার অলৌকিক ক্রিয়াকান্ডের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। ফলে তাঁর ভক্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। একবার এক ভক্ত তার অসুস্থ ছেলেকে এনেছেন ক্ষ্যাপার কাছে। ছেলের কঠিন অসুখ, ডাক্তার হাল ছেড়ে দিয়েছে ! তাই ভক্তটি আছড়ে পড়লেন ক্ষ্যাপার পায়ে! চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিয়ে বললেন “বাবা, দয়া করুন ! আমার একমাত্র ছেলেকে বাঁচান !” ক্ষ্যাপা তো প্রথমেই অশ্রাব্য গালিগালাজ শুরু করলো, তারপর বললো “শালা পাপী কোথাকার ! তোর ছেলে মরাই ভালো ! যা যা, দূর হ !” এই কথা গুলো বলেই ক্ষ্যাপা ঐ অসুস্থ ছেলেটিকে প্রচন্ড প্রহার করতে লাগলেন ! ভক্ত কাঁদতে কাঁদতে বলল “বাবা আমি মহাপাপী! জীবনে আর কোনদিন পাপ কাজ করবো না!” ক্ষ্যাপা আপন-মনে কয়েকবার বিড়বিড় করে তারা মা-র নাম উচ্চারণ করে বললেন — “তারা মা-কে ডাক্! তোর ছেলে ভালো হয়ে যাবে!” কিছুদিনের মধ্যে অসুস্থ ছেলেটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছিল !

 

তারা মায়ের পাগল ছেলে শংকর ক্ষ্যাপা কখন কেমন মেজাজে থাকে তার ঠিক নাই ! কখনো মানুষ দেখলেই ইঁট-পাটকেল ছুঁড়ে মারে, আবার তাঁর কাছে মানুষজন এলে হয়তো মারধর করতে শুরু করেন। তারই মধ্যে ভক্তের দল এসেছে এবং ইচ্ছা করে মারধরও খেয়েছে আর তাতেই তাদের দূর হয়েছে রোগ ও পাপ-তাপ !

তারা মায়ের সন্তান জন্মসিদ্ধ শংকর সর্বত্যাগী, শ্মশানবাসী হয়ে গায়ে চিতাভস্ম মেখে ক্ষ্যাপার অভিনয় করে তারা লীলা করে গেলেন তারাপীঠে ! ভক্তজনের কাছে তিনিই ছিলেন সাক্ষাৎ শিব-স্বরূপ ! একমাত্র তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তরা নিজের প্রচেষ্টায় এই যোগীর নিষ্কাম সাধনা ও সিদ্ধির কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং অনেকেই তাদের আপন আপন বাসনার সিদ্ধিও করে নিয়েছিলেন।

 

অনেক ভক্তই ক্ষ্যাপার জন্য দামী দামী কাপড় চোপড় ও ভালো ভালো খাবার জিনিস নিয়ে আসতো ! ক্ষ্যাপা সাধারণতঃ এই সবের কিছুই গ্রহণ করতেন না,তবে খেয়াল হলে কখনো কখনো খাবারগুলো পেটপুরে খেয়েও নিতেন ! ভক্তরা জোর করে ক্ষ্যাপার গায়ে কাপড় চোপড় জড়িয়ে দিলে কিছুক্ষণ গায়ে রেখে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন সেগুলি!

 

একবার এক ভক্ত ভালো ভালো খাবার এনে ক্ষ্যাপাকে খাবার জন্যে অনুরোধ করতেই তিনি খাবার গুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন” শালা ! নিজের মা-বাবাকে খেতে দিস না! আর আমাকে আলছিস খ’-তে ! শালা পাপী কোথাকার!” ভক্তটি তৎক্ষণাৎ শঙ্করের পায়ে ধরে বলল” বাবা ! তুমি আমাকে রক্ষা করো !” শংকর শুধু বলল তারামাকে ডাক্ গা শালা! আমি কেউ লয়!” ‘পিতা-মাতা প্রসন্ন না হলে ধর্ম-কর্ম করে কিছু হয় না’ এ কথায় বিশ্বাস করতেন শংকর ক্ষ্যাপা ! ‘পিতা-মাতাই এই জগত সংসারে সবচেয়ে বড় জিনিস’_ এই জ্ঞান‌ই ভক্তটিকে দিলেন তিনি !

 

সাধক শংকর শংকর ক্ষ্যাপা কোনো যুক্তির মাধ্যমে না গিয়ে সর্ব অবস্থায় তারা মায়ের নাম করতে বলতেন। তিনি একটা কথাই বারবার বলতেন_ “তোরা সব তারা মায়ের নাম কর্, তারা মায়ের নাম কর্! এই নাম‌ই একমাত্র আশ্রয় ! নামের গুনেই জীবের সমস্ত জ্বালা দূর হয়ে যায় ! সাধক শংকরক্ষ্যাপা মনে করতেন ঈশ্বর অনুভূতিসাপেক্ষ, তিনি কখন‌ই প্রমাণ বা যুক্তিসাপেক্ষ নন। ক্ষ্যাপা ভক্তিযোগের কথাই গৃহীদের বলতেন। তারা মা-ই ঈশ্বর প্রেমীদের শান্তির পথে এগিয়ে দেন।

মাঝে মাঝেই শংকর তারাপীঠের দোকানে দোকানে ঢুকে দোকানে জিনিসপত্তর ফেলে দিয়ে নষ্ট করে দিতেন। দোকানের মালিকেরা ক্ষ্যাপাকে কখনোই গালিগালাজ করতো না বরং তাঁর এরূপ আচরণে খুব খুশি হোতো । ক্ষ্যাপা যা খুশি তাই করতে পারে তারাপীঠ যেন তারই আপন রাজত্ব ! দোকানের মালিকদের ধারণা বা বিশ্বাস জন্মেছিল _ক্ষ্যাপা জিনিসপত্র নষ্ট করলেও তাদের কোনো লোকসান হয় না বরং ক্ষ্যাপার পায়ের ধুলো দোকানে পড়লে তাদের খদ্দের বা বিক্রি ও বাড়ে এবং সত্যি সত্যিই তাই হোতো । একদিন একটা মুদির দোকানে ঢুকে এক টিন সরষের তেল ফেলে দিল ক্ষ্যাপা ! দোকানের মালিক তাঁকে গালিগালাজ না করে আনন্দে “জয় তারা”, “জয় শংকর ক্ষ্যাপা” বলে চিৎকার করে উঠেছিল!

 

তারা মায়ের মন্দিরের একেবারে নিচে, সিঁড়ির এক প্রান্তে বসে ‘বলরাম মন্ডল’ নামে একজন ফুলবিক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে ফুল বিক্রি করে আসছিল। একদিন একটি ঘটনা ফুল বিক্রেতাটিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল!

 

ঘটনাটি নিম্নরূপ :–

তখন গ্রীষ্মকাল! সেদিন মন্দিরের পাশেই একটি দোকানের খোলা বারান্দায় ফুলবিক্রেতা ঘুমিয়ে ছিল। গভীর রাতে হঠাৎ কে যেন তার গায়ে হাত দিয়ে ডাকলো_ ” এই, তাড়াতাড়ি ওঠ!” চমকে উঠে সে দেখল ধবধবে সাদা কাপড় পড়ে, খালি গায়ে কে যেন একজন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে ! ফুলবিক্রেতা তাকে জিজ্ঞেস করল “কে আপনি ?” “আমি শংকর ক্ষ্যাপা! তোর কোনো ভয় নাই ! আমাকে দুটো ফুল দে তো !” সেই আগন্তুক বলল। শংকরক্ষ্যাপা!! ফুলবিক্রেতা নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না ! দিনের আলোয় যে শংকরকে দেখেছে, তার সঙ্গে যেন এই আগন্তুকের মিল খুঁজে পায়না সে ! এ যেন সাক্ষাৎ মহাযোগী ! বামাক্ষ্যাপার পূর্ণাবয়ব ! আগন্তুক বলল — “কই ফুল দে!” দোকানদার আবার জিজ্ঞাসা করল “এত রাত্রিতে ফুল নিয়ে কি করবে?” আগন্তুক বলল” মায়ের পাদপদ্মে দেব!”

দোকানদার — “এত রাত্তিরে? তাছাড়া এই অন্ধকারে শ্মশানের পথে ?”

আগন্তুক — “ঠিক চলে যাব ! তারা মায়ের নামের গুনে সব পরিষ্কার হয়ে যায়!”

দোকানদার তার ফুলের ধামা খুঁজে দেখল যে, সেখানে একটাও ফুল নাই। তাই সে বলল_” কিন্তু বাবা, আমার ধামাতে তো একটাও ফুল নাই! আজ যে সব ফুল বিক্রি হয়ে গেছে ! তুমি বরং কালকে এসো !”

 

আগন্তুক বলল “আছে রে– আছে! ভালো করে খুঁজে দ্যাখ্ !” ফুলবিক্রেতা ক্ষ্যাপার কথায় ধামাটা খুঁজতে গিয়ে দেখে, সত্যিই তো সদ্য গাছ থেকে তোলা হয়েছে এমন কয়েকটা রাঙা জবা ধামার তলাতে পড়ে আছে ! এটা দেখেই তার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল! কোন রকমে সে ক্ষ্যাপার হাতে ফুলগুলি দিতেই ক্ষ্যাপা বলল “তারা মায়ের নাম কর্ ! তোর ভালো হবে!” এই বলে শ্মশানের দিকে চলে গেল সে! পরবর্তীতে বলরামের খুবই উন্নতি হয়েছিল।

বাকসিদ্ধ পুরুষ শংকর ক্ষ্যাপা এই কথা শুনে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তারাপীঠ মহাশ্মশানে এসেছে তার দুখিনী মা! মেয়ের বিয়ে হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে কিন্তু কোনো সন্তান দিতে না পারায় সংসারে অশান্তি ! স্বামী-শাশুড়ি, এমনকি পাড়া-প্রতিবেশী সকলের কাছে অবহেলিত মেয়েটি চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ক্ষ্যাপার পায়ে লুটিয়ে পড়ে !

 

বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগেও সুসভ্য সমাজে লোকচক্ষুর অন্তরালে কতশত ‘রবীন্দ্রনাথের নিরুপমা’-র চোখের জলে বুক ভাসে তার হিসাব নাই ! ক্ষ্যাপা মেয়েটির স্বামীর উদ্দেশ্যে গালিগালাজ শুরু করে দিলেন , তারপর শান্ত হয়ে বিড়বিড় করে কয়েকবার তারা মায়ের নাম উচ্চারণ করে বললেন _”হবে রে হবে, তোর ছেলে হবে! তারা মাকে ডাক্! তোর সব বিপদ কেটে যাবে !” কিছুকাল পরে মেয়েটি একটি পুত্র সন্তান লাভ করে সংসারে সকলের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিল। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। রামপুরহাট কলেজের অর্থনীতির প্রধান অধ্যাপক এবং স্বনামধন্য ব্যক্তি প্রণব কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তারা মায়ের পুজো দিতে।

 

পূজার শেষে তারা শ্মশানে এসে বামাক্ষ্যাপার সমাধি মন্দিরের নিচে দাঁড়িয়েছেন এমন সময় শ্মশানের মধ্য থেকে কে যেন তাদের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগলো! কিছু লোক “জয়শঙ্কর ক্ষ্যাপা” “জয়শঙ্কর ক্ষ্যাপা” — বলে চিৎকার করতে করতে তার পিছনে পিছনে আসছিল! লোকটি আর কেউ নয় শ্মশানচারী শংকর ক্ষ্যাপা! ক্ষ্যাপা অশ্লীল ভাষায় লোকগুলোকে গালাগালি দিচ্ছিল! একসময় শংকর ক্ষ্যাপা প্রণব বাবুর স্ত্রীর পাশে এসে থমকে দাঁড়ালো এবং তার চশমাটা খুলে নিয়ে তাঁর নিজের বাম চোখ বন্ধ করে অপর চোখ দিয়ে চশমার একটা গ্লাসকে ভালোভাবে দেখতে দেখতে মন্তব্য করল “তোর খুব কাছের মানুষ চলে যেছে রে ! তোর খুব কাছের মানুষ চলে যেছে !” এই বলে চশমাটা তার হাতে দিয়ে ক্ষ্যাপা চলে গেল। ঘটনার কিছুকাল পরেই প্রণব বাবু কঠিন রোগে ভুগে পরলোকগমন করেছিলেন।

 

শংকর ক্ষ্যাপার সংস্পর্শ লাভ করে অনেক রোগীর কঠিন কঠিন অসুখ সেরে গেছিলো। তাঁর আশীর্বাদে কত নিঃসন্তান পিতা-মাতা সন্তান লাভ করেছে তার ইয়ত্তা নাই। তাই ভক্তদের আনাগোনাও দিনকে দিন বাড়তে থাকলো এবং ভক্তরা তাকে খুব‌ই বিরক্ত করতে থাকলো। ভক্তের দল সবসময় ক্ষ্যাপাকে ঘিরে ধরে বসে থাকে। তাঁকে বিড়ি খেতে দিয়ে সেই এঁটো বিড়ি কুড়িয়ে খেয়ে, তাঁর হাতে মার খেয়ে বা যে কোনো ভাবে তাঁর স্পর্শ লাভ করে ভক্তরা নিজেদেরকে ধন্য মনে কোরতো।

 

তারাপীঠ মহাশ্মশানকে ঘিরে কত বিচিত্র লীলা! এই শ্মশানে সাধনা করেছেন বশিষ্ঠ, কৈলাস পতি বাবা, বামাক্ষ্যাপা এবং শংকর বাবা ! পরবর্তীতে হয়তো আরো অনেক সাধু-সন্ন্যাসী, যোগীরা এই মহাশ্মশানে আসবেন এবং সাধনা করে চলবেন তিলা মায়ের কৃপা লাভের জন্য।

 

শেষের দিকে ভক্তদের অত্যাচারের আতিশায্যে তাঁর ভাগনা মানিক দাস শংকরকে নিয়ে তার নিজের বাড়ি কৌড়বেলে গ্রামে নিয়ে আসে। কিন্তু ভক্তের দল সেখানেও ছুটে যেত ক্ষ্যাপার দর্শনে!

১৯৮৭ সালের ২৪ শে মার্চ। সেদিন সকাল থেকেই ভক্তের দল ক্ষ্যাপাকে ঘিরে রয়েছে ! সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুরের আহারের শেষে তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকে মগ্ন হলেন মহাযোগে ! উপস্থিত ভক্তরা কেউ বুঝতেই পারলো না কখন যে সাধকের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল সেকথা ! মৃত্যু হোল সাধক শংকর ক্ষ্যাপার। তাঁর ইচ্ছাতেই তাঁকে তাঁর পৈতৃক ভিটায় সমাধি দেওয়া হয়েছিল।

 

মৃত্যু হোল সাধক শংকরক্ষ্যাপার। তবে, পরম সিদ্ধ সাধকের মৃত্যু নাই। যতদিন ভারতবর্ষের বুকে তারাপীঠের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন মা তারার সঙ্গে যেমন বেঁচে থাকবেন সাধক বামাক্ষ্যাপা, ঠিক তেমনি থাকবেন মা তারার আর এক প্রিয় সন্তান সিদ্ধ সাধক শংকর বাবা।

জয় গুরু বামদেব। জয় শঙ্কর খ্যাপা’। জয় মা ব্রহ্মময়ী তারা।

 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

x