বাস্তু শাস্ত্র কি বিজ্ঞান  ? জেনে নিন বাস্তু শাস্ত্র এবং তার রহস্য

বাস্তু শাস্ত্র কি বিজ্ঞান ? জেনে নিন বাস্তু শাস্ত্র এবং তার রহস্য

বাস্তু শাস্ত্র কি বিজ্ঞান ? বহু প্রাচীন যুগ ধরে চলছে আসছে এই বাস্তু শাস্ত্র। আসুন জেনে নিন কি রহস্য লুকিয়ে আছে এই এর মধ্যে

বাস্তু শাস্ত্র – পঞ্চভৌতিক তত্ত্ব ও বাস্তু বাস্তু শাস্ত্র হল এই ভারতীয় ঊপমহাদেশের এই সুপ্রাচীন জ্ঞান- যে জ্ঞান মানুষ থেকে মানুষে বাহিত হয়ে আসছে হাজার বছর ধরে। এই জ্ঞান এক দিনে এই পৃথিবীর মানুষ জানতে পারেনি। এটা জেনেছে হাজার বছরের পর্যবেক্ষণ জ্ঞান থেকে- সাথে গভীর নক্ষত্র জ্ঞান এর সাথে যুক্ত হয়েছে- ফলে এই বাস্তু বিদ্যা হয়ে উঠেছে মহান ।

বাস্তু শব্দ টি এসেছে বস্তু থেকে- বস্তু মানে যেকোনো বস্তু, মুলত বাস্তু বলতে সব কিছুকেই বুঝায়- তা একটি স্থান হতে পারে- কিংবা একটা বাড়িও হতে পারে। ভারত উপমহাদেশে প্রায় সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে স্থাপত্য নির্মাণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

বাস্তু শাস্ত্র কি বিজ্ঞান  ? জেনে নিন বাস্তু শাস্ত্র এবং তার রহস্য

এখন প্রশ্ন আস্তে পারে , বাস্তু শাস্ত্র কী ?

বাস্তু কথাটা এসেছে সংস্কৃত শব্দ বস্তু থেকে। শব্দটির অর্থ – যেকোনো সৃষ্টিই হল বাস্তু। আবার বস্তু হল ” ভূ ”। অর্থাৎ পৃথিবী। এই পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি হওয়া সমস্ত কিছুই বাস্তু। ময়মতম্ – এ ময়া জানাচ্ছেন , সকল নশ্বর এবং অবিনশ্বরের আবাসস্থলই বাস্তুর অন্তর্গত। বাস্তুকে বলা যেতে পারে ভারতীও স্থাপত্য বিজ্ঞান। বিস্তৃত ভাবে এই বিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত ইঞ্জিনিয়ারিং , নগর পরিকল্পনা , স্থাপত্যবিদ্যা , ভাস্কর্য এবং চিত্রকলা।
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই ভারতীও উপমহাদেশে শিল্পচর্চাকে ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া হয়েছে। স্থাপত্যশৈলী উপবেদের অন্যতম বিষয়। স্থাপত্য উপবেদ বা স্থাপত্যশাস্ত্র চারটি উপবেদের অন্যতম। স্থাপত্য উপবেদ আবার অথর্ববেদ থেকে এসেছে। প্রায় ৫০০০ বছর ধরে বাস্তুবিদ্যা কালের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রামে জয়ী হয়েছে। স্থাপত্য উপবেদ বা স্থাপত্য শাস্ত্রের সূত্রগুলি পরবরতিকালে ‘বাস্তুশাস্ত্র’ শিরোনামে লিপিবদ্ধ হয়েছে। বৈদিক যুগে স্থাপত্য বিজ্ঞান মূলত মন্দির নির্মাণে ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে তা বিস্তার লাভ করে। প্রাচীন যুগে স্থপতিরা কেবল নিছক রাজমিস্ত্রির ভূমিকা পালন করতেন না , নির্মাণশৈলী ও পরিকল্পনার বিষয়টিও তদারক করতে হত তাঁদের।

বাস্তু শাস্ত্র কি বিজ্ঞান  ? জেনে নিন বাস্তু শাস্ত্র এবং তার রহস্য

ভারতীও বাস্তুবিদ্যাকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়।
যথা – 1.বাস্তু , 2.শিল্প ও 3.চিত্রকলা ।

1. বাস্তু – কারিগরি , নগর-পরিকল্পনা , সাধারণ স্থাপত্য , প্রাসাদ অথবা বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণ।
2. শিল্প – মূর্তিবিদ্যা , মৃৎশিল্প , ভাস্কর্য।
3. চিত্রকলা – অঙ্কন।
বিস্ময়কর ভাবে বর্তমান জুগেও একই পদ্ধতি অনুসৃত হচ্ছে।

বাস্তুর আবির্ভাব সম্পর্কে মৎস্যপুরাণে অধ্যায় ২৫ এ বলা হয়েছে , প্রাচীনকালে অন্ধকাসুর বধের সময় ভগবান শিবের ললাট থেকে পৃথিবীতে যে স্বেদ বিন্দু পড়েছিল তার থেকে এক ভয়ঙ্কর আকৃতির দেবতার উদ্ভব হয়। সনাতন পৌরানিক কাহিনী মতে একবার অসুর ও দেবতাদের যুদ্ধে দেবতারা অসুরদের সাথে পেরে না উঠতে পেরে সবাই নিজ নিজ তেজ থেকে এক দেবতা সৃষ্টি করলেন- যার নাম হল বাস্তু দেব- ঊনি জন্ম নিয়েই সকল অসুরদের খেয়ে ফেলেন- কিন্তু উনার খিদে মেটেনা- শেষে ঊপায় না পেয়ে দেবতারা সেই বাস্তু দেবের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে অবস্থান নেন এবং বাস্তু দেবের খিদে নিবৃত হয়। তারপর তিনি এই পৃথিবীকে ধারন করেন।

মৎস্যপুরাণ অনুসারে বাস্তুপুরুষকে যখন দেবতারা পৃথিবীর বুকে ফেলে দিয়েছিলেন তখন তাঁর মাথা ছিল উত্তর-পূর্ব দিক বা ঈশানে। আর পা ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমে। বাস্তুপুরুষের তিনটি অবস্থার কথা জানা যায়।

নিত্যবাস্তু – বাস্তুপুরুষের অবস্থান প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর পরিবর্তিত হয়। নিত্য বাস্তুর ভিত্তিতে বাড়ি তৈরির কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

চরবাস্তু – চরবাস্তুর অবস্থান প্রতি চান্দ্র মাসে বদলায়। বাড়ি তৈরির কাজ শুরু, প্রধান দরজার ফ্রেম স্থাপন , কূপখনন এবং গৃহপ্রবেশ ইত্যাদি বাড়ি নিরমানের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো এই চরবাস্তুর উপর নির্ভর করে।

স্থিরবাস্তু – বাস্তুপুরুষ পেটের ভারে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকেন। মাথা থাকে উত্তর-পূর্ব দিকে , দুতি পা নিতম্ব দক্ষিণ-পশ্চিমে , হাঁটু ও কনুই দক্ষিণ-পূর্বে এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে। বাড়ির দরজা, জানালা বসান ও বিভিন্ন ঘর তৈরির প্রকৃত কাজই হল স্থিরবাস্তু।

বাস্তু শাস্ত্র কি বিজ্ঞান  ? জেনে নিন বাস্তু শাস্ত্র এবং তার রহস্য

ব্রহ্মস্থান

জমির মধ্য বিভাজন স্থানকে ব্রহ্মস্থান বলা হয়। ৮১টি পরিভাষা ( স্প্যান ) , ৯টি বর্গ যেখানে বাস্তুপুরুষের নাভিস্থলের পারদিকে অবস্থান করছে, সেটি হল ব্রহ্মস্থান। ‘ময়মতম্’ অনুসারে যে সব গুরুত্বপূর্ণ স্থান আছে সেগুলিকে ‘মর্ম’ বলা হয়। এগুলো আক্রকম রেখা যা উত্তর থেকে দক্ষিণ জুড়ে রয়েছে এবং পূর্ব থেকে পশ্চিম জুড়ে রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণ রেখাকে নাড়ি বলে এবং ‘পূর্ব-পশ্চিম’ রেখাকে ” বংশ ” বলা হয়। ব্রহ্মস্থানের কোনাকুনি সরলরেখা টানলে সেটি হবে ” কোণসূত্র “। এইটি প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বাড়ি তৈরির সময় এর সুরক্ষা প্রয়োজন।

বৃহদসংহিতা অনুসারে লম্বা কোণাকুণি সরলরেখা সেখানে গিয়ে মিলিত হচ্ছে এবং বর্গগুলির মধ্যস্থল হল এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এই স্থানটিকে যেন কোনোভাবেই আঘাত করা না হয়। বাসস্থানে ব্রহ্মস্থান রাখার এবং কারখানা ও কর্মস্থলে ব্রহ্মস্থানটিকে বিশেষ গুরুত্বে রাখার পৃথক নিয়ম রয়েছে।

” সুখমিচ্ছনব্রহ্মানং যত্নাদ্রক্ষেদ গৃহী গৃহান্তস্থং। “

বাস্তু উপদেষ্টা ও আচার্য :———-

বাস্তুশাস্ত্রে আঠারোজন উপদেষ্টা ও আচার্য আছেন। মৎস্যপুরানের ২৫২ অধ্যায়ে এঁদের কথা উল্লিখিত আছে। যথা- ভৃগু , অত্রি , বলিষ্ঠ , বিশ্বকর্মা , ময় , নারদ , নগ্নজিৎ , বিশালাক্ষ , পুরন্দর, ব্রহ্মা , কুমার , নন্দিশ , শৌনক , গর্গ , বাসুদেব , অনিরুদ্ধ , শুক্র ও বৃহস্পতি।

পঞ্চভৌতিক তত্ত্ব ও বাস্তু

এই পৃথিবী পঞ্চভূতাত্মক। এতে তত্ত্বের সমাবেশ ঘটেছে। এই পাঁচটি তত্ত্ব হল -ক্ষিতি, অপু, তেজ, মরুৎ, ব্যোম। ঠিক একইভাবে মানুষের শরীরেও এই পাঁচটি তত্ত্বের মিশ্রণ ঘটেছে। একইভাবে পৃথিবীর ওপর যে কোনও ধরণের নির্মাণ এই পাঁচটি তত্ত্বের ওপর গড়ে ওঠে। সুতরাং স্থূল ও সূক্ষ্ম উভয়ার্থেই এই তত্ত্ব কার্যকরী। মানুষ তার নিজের বুদ্ধিতেই এই তত্ত্বের রহস্য জেনেছে। কিন্তু এই পঞ্চভূতের সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য অন্তঃসম্বন্ধকে নিজের ইচ্ছানুসারে সামঞ্জস্য করার ক্ষমতা তার সাধ্যের বাইরে। সুতরাং প্রকৃতির পঞ্চভূতাত্মক ব্যবস্থাকে ব্যাহত না করে আমাদের চলতে হবে। যদি ওই ব্যবস্থায় কোনও রকমের নাক গলানো হয় তা হলে অনেক রকমের অঘটন বা বিপদ দেখা দিতে পারে। বাস্তুশাস্ত্রের নিয়মগুলি পড়লেই বুঝা যাবে, প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করে আমরা যদি আমাদের বাসস্থান বা কর্মস্থলের নকশা তৈরী করি , তা হলে সেখানকার বাসিন্দা বা কর্র্মীদের মধ্যে পারস্পরিক মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং জীবন কাটবে অপার সুখশান্তিতে।

আকাশ / ব্যোম ——-
পৃথিবী বিশ্বব্রহ্মান্ডের অনন্ত মহাশূন্যের একটি স্থানে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় বিরাজ করছে। মহাশূন্যে নানা গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব পৃথিবীর বুকে প্রভাবিত হচ্ছে। পৃথিবীর প্রাণিজগতের ওপরও এর প্রভাব প্রতিফলিত হয় নিরন্তর। পৃথিবীর বুকে আসছে আলো , তাপ , চৌম্বক শক্তি এবং নানাবিধ শক্তি।

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ সবের জন্যেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডল বা সমুদ্রে এবং নদীতে তৈরি হচ্ছে ঢেউ। প্রাণিজগতের ওপরও এই সমস্ত প্রভাব সদাসর্বদাই পড়ছে। জীবনের ওপর প্রভাব , বিশেষ করে মানবজীবনের ওপর প্রভাব নিয়েই জ্যোতিষশাস্ত্র পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে। জ্যোতষশাস্ত্র সূর্য , চন্দ্র , মঙ্গল , বুধ , বৃহস্পতি , শুক্র , শনি , রাহু , কেতু ইত্যাদি গ্রহের এবং রাশির সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রহনক্ষত্র এবং রাশিচক্র পৃথিবীর জীবনের ওপর প্রভাবিত। আকাশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শব্দ।

বায়ু / মরুৎ


আমরা জানি বায়ু হল বিভিন্ন গ্যাসের সমন্বয়। পৃথিবীতে এই বাতাসে আছে অক্সিজেন – ২১ শতাংশ, নাইট্রোজেন – ৭৮ শতাংশ আর বাকি অংশে আছে অন্যান্য গ্যাস – হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন , কার্বন ডাইঅক্সাইড ইত্যাদি। এই বায়ু প্রাণিজীবনের প্রধান অঙ্গ। তার কারণ বায়ু ছাড়া কোনও প্রাণের অস্তিত্ব সম্ভব নয়। আর এই বায়ু আছে বলেই পৃথিবীর বুকে শব্দ সৃষ্টি হয়েছে। বায়ু শব্দকে বহন করে আর বায়ু থেকেই আসছে অনুভূতি বা স্পর্শ। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল স্পর্শ এবং শব্দ।

অগ্নি / তেজ 

অগ্নি হল সমস্ত শক্তির উৎস। সৌরশক্তি , বৈদ্যুতিক শক্তি , আণবিক শক্তি এবং প্রাণিজ শক্তি – সবই আমরা পাই অগ্নি থেকে। আর এই অগ্নি থেকে সৃষ্টি তাপ আর আলোর। তাপ এবং আলোবিহীন জীবন আমরা ভাবতেই পারি না। এর বৈশিষ্ট্য হল শব্দ , স্পর্শ ও রূপ।

জল / অপ্ 


জলের তিনটি অবস্থা: তরল , কঠিন ( বরফ ) , এবং বাতাসে মিশ্রিত ( অদৃশ্য ) জলীয় বাষ্প। মেঘ হল জলীয় বাষ্প সম্পৃক্ত বাতাসে ঘনীভূত জলবিন্দুর সমষ্টি।
প্রাণীজীবনে অন্যতম এবং মূল্যবান উপাদান হল পানি। পৃথিবীর পানি আছে বলেই প্রাণের এত প্রাচুর্য। প্রকৃতির বুকে এত সবুজের সমারোহ। গাছ-গাছালি , মানুষ , পাখি , জীবজন্তু প্রত্যেকেরই পানি অত্যন্ত প্রয়োজন। এই পৃথিবীর তিন ভাগ পানি আর এক ভাগ স্থল। আমাদের শরীরে যে রক্ত প্রবহমান, তার বেশিরভাগ অংশ জুড়ে আছে হিমোগ্লোবিন ও অক্সিজেন। রক্তের মধ্যে সেই পানিই বিরাজ করছে। আবার পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায় খাল , বিল , নদী , নালা , সমুদ্র , এমনকি আকাশের মেঘ, বৃষ্টি-সবার মাঝেই রয়েছে পানি। আর এই পানির জন্যই পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছে রসের। পানির বৈশিষ্ট্য হল শব্দ , স্পর্শ , রূপ ও রস।

পৃথিবী / ক্ষিতি 


ধরিত্রী বা পৃথিবী হল বৃহৎ একটি চুম্বক যার মধ্যে আছে উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু। এর জন্যেই সৃষ্টি হচ্ছে নানাবিধ আকর্ষণ। পৃথিবীর এই চৌম্বকক্ষেত্র জুড়ে রয়েছে মাধ্যকর্ষণ শক্তি। আর এর থেকেই পৃথিরীর সমস্তবিষয়ে চেতন এবং অবচেতনের ফল লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ জাগতিক এবং অজাগতিক শক্তি পরিলক্ষিত হয়। ধরিত্রী বা পৃথিবীর দুই প্রান্ত সাড়ে তেইশ মধ্যাহ্নিক অবস্থায় আছে যার জন্য বছরের ছয় মাস উত্তরায়ণ এবং বাকি ছয় মাস দক্ষিণায়ন। পৃথিবী তার নিজের অক্ষে অর্থাৎ মেরু রেখার পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘুরছে। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে দিন এবং রাত্রির। আর পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে তার কক্ষপথ ধরে সম্পূর্ণ পরিক্রমা করতে সময় নিচ্ছে প্রায় ৩৬৫ ১/৪ দিন অর্থাৎ এক বৎসর। আগেই বলা হয়েছে পৃথিবীর তিনভাগ পানি আর একভাগ স্থল। ধরিত্রীতে এই পাঁচটি গুণই বর্তমান।যথা- শব্দ , স্পর্শ , রূপ , রস ও গন্ধ।

[ ভারতীও বাস্তশাস্ত্রের মতও চীনে ফেং সুই শাস্ত্র একটি প্রাচিন স্থাপত্য শাস্ত্র। ]

বাস্তু শাস্ত্র বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি 

 

‘‘ দিক ” এবং ‘’ সৌরশক্তি ” ছাড়াও বাস্তুশাস্ত্র অনুযায়ী গৃহনির্মাণ কীভাবে মহাজাগতিক রশ্মির কম্পনের উপর নির্ভরশীল। এই মহাজাগতিক কম্পনগুলির উৎস এক ও অভিন্ন। এরই উৎস থেকে বিকীর্ণ হয়ে মহাজাগতিক শক্তি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ড. হার্টম্যান ভূপৃষ্ঠের গায়ে তারের জালির মতো লেগে থাকা একগুচ্ছ রশ্মি আবিষ্কার করেন। ধনাত্মক এবং ঋণাত্বক আধারযুক্ত এই রশ্মিগুলি উল্লম্বভাবে ভূমি থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে – অনেকটা তেজস্ক্রিয় প্রাচীরের ধাঁচে। প্রতিটির ঘনত্ব ২১ সেন্টিমিটার। উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রতি ২ মিটার অন্তর এই ধরণের রশ্মি বিকিরণ হয়। মিশরে চিপোর পিরামিডের গাণিতিক বীজগুলির সঙ্গে এই মহাজাগতিক রশ্মিগুচ্ছের অত্যাশ্চর্য মিল রয়েছে। এর্মেজ হার্টম্যান এও আবিস্কার করেন যে ভূপৃষ্ঠ থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মিগুলি পরস্পর ছেদ করে। এই ছেদবিন্দুগুলি মানবদেহের ওপর অত্যন্ত অশুভ প্রভাব ফেলতে পারে। কয়েকটি ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে ‘’ হার্টম্যান নেটওয়ার্ক ” -এর ছেদবিন্দু। অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রভাব ( শারীরিক , পরিবেশগত ইত্যাদি ) ছাড়াও বাস্তুশাস্ত্রে ভূমি থেকে নির্গত হয়ে ভূমণ্ডল পরিবেষ্টনকারী এই শক্তির বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

আমাদের জীবন নির্ভর করে প্রকৃতির পাঁচটি শক্তি- সূর্যের বিকিরণ , পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র , মাধ্যাকর্ষণ , বাতাসের গতিবেগ এবং মহাজাগতিক শক্তি সমুহের উপর। সূর্যের রশ্মি হল তড়িৎ চ্চুম্বকীয় বিকিরণ। এই বিকিরণ ব্যাপ্তি সুদুর বিসতৃত ক্ষেত্রে, তা মহাজাগতিক রশ্মি থেকে বেতার তরঙ্গেও , সূর্যরশ্মির একটি সামান্য অংশ যা আমরা খালি চোখে দেখতে পাই এবং যা সাদা রঙের , পিছনে লুকিয়ে আছে রামধনুর সাত রং-বেনীআসহকলা (Vibgyor)। এই রংগুলি হল বেগুনি , নীল , আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা ও লাল। আসলে রংগুলি রয়েছে বেগুনি থেকে লালের মধ্যেই। বেগুনি রঙের থেকে বেশি ক্ষমতার রশ্মিকে বলে অতিবেগুনি (Ultraviolet) রশ্মি। আর লাল রঙের থেকে বেশি ক্ষমতার রশ্মিকে বলে লাল উজানি (Infrared) রশ্মি। মানুষের জীবনে লাল উজানি রশ্মি অতি প্রয়োজনীয়। এই রশ্মির সাহায্যে প্যারালিসিস , পেশির বেদনা ও নানাবিধ রোগের উপশম সম্ভব। অথচ অতিবেগুনি রশ্মি মানুষের জীবনের পক্ষে ক্ষতিকর। এই অতিবেগুনি রশ্মির কারণে দেহে জিনঘটিত নানা রোগ সৃষ্টি তো হয়ই সেই সঙ্গে বিভিন্ন চর্মরোগ সৃষ্টি করে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সূর্যরশ্মি বিজ্ঞান সম্পর্কে বিশদ আলোচনা আছে। আমরা জানি যে ছবি তোলার সময় সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির হাত থেকে বাঁচতে আলট্টাভায়োলেট ফিল্টার (UV Filter) ব্যবহার করেন ফটোগ্রাফাররা।
বাস্তুশাস্ত্র এর মূল কথাই হল, কেমন করে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির হাত থেকে মানবজীবনকে রক্ষা করে উপকারী লাল উজানি রশ্মির সুফল লাভ করা যায়। সেই কারণে বাড়িঘর এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে বাড়িতে অতিবেগুনি রশ্মি না ঢুকতে পারে। বরং লাল উজানি রশ্মির যাতায়াত অবাধ হয়। যেহেতু লাল উজানি রশ্মি আসে উত্তর-পূর্ব দিক থেকে সেই কারণে ব্স্তুশাস্ত্রে বাড়ির উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে বেশি খোলা রাখতে বলা হয়েছে। আবার অতিবেগুনি রশ্মি দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে বেশি পরিমাণে আসে বলে বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম দিকটি কম খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে বাস্তুশাস্ত্র।

মাধ্যাকর্ষণ শক্তি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ সবের জন্যেই পৃথিবীর বায়ুমন্ডল বা সমুদ্রে এবং নদীতে তৈরি হচ্ছে ঢেউ। প্রাণিজগতের ওপরও এই সমস্ত প্রভাব সদাসর্বদাই পড়ছে। জীবনের ওপর প্রভাব , বিশেষ করে মানবজীবনের ওপর প্রভাব নিয়েই জ্যোতিষশাস্ত্র বা জ্যোতির্বিজ্ঞান গড়ে উঠেছে। জ্যোতিষশাস্ত্র সূর্য , চন্দ্র , মঙ্গল , বুধ , বৃহস্পতি , শুক্র, শনি , রাহু , কেতু ইত্যাদি গ্রহের এবং রাশির সঙ্গে সম্পর্কিত। গ্রহনক্ষত্র এবং রাশিচক্র পৃথিবীর জীবনের ওপর প্রভাবিত। আকাশের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল শব্দ।

আমরা জানি যে পৃথিবী নিজেই একটি বৃহৎ চুম্বক। চুম্বকের ধর্ম হল তাকে যদি খণ্ড খণ্ড করে হাজার টুকরো করা যায় তবে প্রতিটি খণ্ডই একটি চুম্বকে পরিণত হয় যাতে চুম্বকীয় ধর্মগুলি বিদ্যমান থাকে। অনুরূপে সমগ্র পৃথিবীকে শত-সহস্র খণ্ডে বিভক্ত করলে প্রতিটি খণ্ডেই চুম্বকীয় ধর্ম থাকবে। তাই একটি বিশাল আকারের জমি হোক বা অতি ক্ষুদ্র প্লটই হোক , প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিটি জমিতে থাকবে চুম্বকের গুণাবলি।

বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি বস্তু থেকেই যার যার নিজস্ব তরঙ্গে প্রতিনিয়ত শক্তি বিকিরণ হয়। কেবলমাত্র কঠিন , তরল , গ্যাসের থেকেই নয় , প্রতিটি অণু , তন্তু ও কোষ থেকেও শক্তি বিকিরিত হয়। কিছু বস্তু থেকে বিকিরিত হয় ধনাত্মক শক্তি, আবার কিছু থেকে ঋণাত্মক শক্তি। যে সমস্ত বস্তু থেকে ধনাত্মক শক্তি বিকিরিত হয় সেগুলি উপকারী । আর যে সমস্তু বস্তু থেকে ঋণাত্মক শক্তি বিকিরণ হয় সেগুলি ক্ষতিকর। বস্তু থেকে বিকিরিত ক্ষতিকর ঋণাত্মক শক্তিকে কেমনভাবে প্রতিহত করা যায় তারও নির্দেশ আছে বাস্তুশাস্ত্রে। সেটিই বাস্তুকলা। আমাদের চারপাশে যে সমস্ত বস্তু বিরাজ করে তার মধ্যে বেশ কিছু ধনাত্মক শক্তিসম্পন্ন এবং বেশ কিছুর রয়েছে ঋণাত্মক শক্তি। আমি পূর্বেই বলেছি ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন বস্তু ক্ষতিকারক। কাজেই এই ঋণাত্মক শক্তিসম্পন্ন বস্তু গুলিকে পরিহার করে চলা উচিত। ধনাত্মক শক্তিসম্পন্ন বস্তুর উদাহরণ হল- পিতল , ক্রিস্টাল , চিনামাটি , সিরামিক , বেশ কিছু পাথর , সুরকি , কাঠ , গাছপালা ইত্যাদি। আর ঋণাত্মক বস্তুসকল হল লোহা, অ্যাক্রিলিক, পলিতিন, নাইলন , পিভিসি , সিন্থেটিক ভিনাইল , গ্রানাইট ইত্যাদি। এই ঋণাত্মক বস্তু সকল পরিহার করলে ভাল। আর ধনাত্মক বস্তু সকল জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই উপকারী। ঋণাত্মক শক্তি সিরোটিনিন ও হিস্টামাইন উৎপন্নণ করে মানবদেহে। যার ফলে অসুস্থতা সৃষ্টি হয় এবং জীবনীশক্তি কমিয়ে দিয়ে হতাশা বাড়ায়।

বাড়ির নকশা করার সময় বাতাসের গতিবেগের কথা মাথায় রাখা অবশ্য প্রয়োজনীয় কেননা বাতাসের গতিবেগ ও দিকনির্দেশ নির্ভর করে সূর্যের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের উপর। তাই চেরাপুঞ্জি প্রবাহিত হাওয়ার গতিবেগ ও সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের হাওয়ার গতিবেগ এক নয়। চেরাপুঞ্জির বাতাসের গতিবেগ পর্বত উপকূলবর্তী বলে অনেক বেশি। আর বৃষ্টিও বেশি। তাই চেরাপুঞ্জির বাড়ির ছাদ ঢালু করা হয়। সমগ্র সাহারা অঞ্চলে এর বিপরীত চিত্র। ছাদের তল করা হয় সমতল।

সূর্যকিরণ সারাদিন ধরে পাই , রাতে পাই না। কিন্তু মহাজাগতিক রশ্মি ২৪ ঘণ্টা ধরেই চলে। অথচ খালি চোখে তা দৃশ্যমান নয়। এই মহাজাগতিক রশ্মিকে বাস্তু পরিকল্পনার সাহায্যে একত্রিত করে মানবজীবনের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়। মজার কথা হল বাস’শাস্ত্রে জমি-বাড়ির সকল ত্রুটি থেকে মুক্তির উপায়ও বলা আছে। আর সেই উপায় খোঁজা যায় অভিজ্ঞ বাস্তুশাস্ত্রীর মাধ্যমে। বাস্তু শুধু কোন দেশের নির্দিষ্ট স্থাপত্যবিদ্যা নয় , আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত শাস্ত্র।

বলা বাহুল্য , বাস্তুশাস্ত্র শিল্প , বিজ্ঞান , গ্রহবিজ্ঞান , জ্যোতিষশাস্ত্র এবং অতীন্দ্রিয়বাদেরই সমন্বয়। মানব সমাজের উপর প্রভাব বিস্তারকারী অন্যান্য বিষয় যেমন আবহাওয়া , তাপমাত্রা , বায়ুচাপ , বাতাসের গতি ও অভিমুখ , রৌদ্রালোক , আদ্রতা , তেজস্ক্রিয়তা , সময়, মহাশূন্য এবং বাসস্তুস্থানের চর্চার অপর নাম বাস্তুশাস্ত্র। হিন্দু শাস্ত্রে এই মহাজাগতিক শক্তিপুঞ্জকে ‘’ মহাভূত ” আখ্যা দেওয়া হয়েছে। এই কম্পন এবং পৃথিবীর পঞ্চতত্ত্বই ( ক্ষিতি , অপ্ , তেজ , মরুৎ , ব্যোম ) বিভিন্ন মহাজাগতিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া জন্য দায়ী। এইগুলি মানব সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করাই বাস্তুশাস্ত্রের লক্ষ্য।

বাস্তু দিক্‌দর্শন ———
বাড়ি তৈরির বিস্তারিত বর্ণনা বাস্তু শাস্ত্রে নির্দেশিত হয়েছে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী বাড়ি তৈরি ———
বাস্তু শাস্ত্র মতে জমির উত্তর-পূর্ব কোণে ভূমির দোষ উদ্ধার করা উচিত। শাস্ত্রমতে দোষ বা ক্রুটি সম্পন্ন করার পরই প্রথম খনন শুরু করা কর্তব্য। চারদিকের জমিকে প্রথমে সমান ভাবে চৌরস করে নিতে হবে। এরপর জমির ঢাল রাখতে হবে উত্তর-পূর্বে। ভিত্তিপ্রস্তর চান্দ্রমাস অনুসারে উপযুক্ত দিকে বিশেষ অনুষ্ঠান পূর্বক স্থাপন করতে হবে। নির্মাণ কাজ প্রথমে দক্ষিণ-পূর্ব দিক্‌ থেকে শুরু করতে হবে। পূর্ব এবং উত্তরে বেশি জায়গা ছাড় দিতে হবে। দক্ষিণ এবং পশ্চিম সীমানার পাঁচিল উত্তর ও পূর্ব দিকের চেয়ে উঁচু আর মোটা করতে হবে। মূল বাড়িটি রাস্তার তল থেকে কমপক্ষে দু ফুট উঁচু করে করা উচিত। মনে রাখা দরকার যে প্রথম খনন করার সময় শুভ মুহূর্ত অনুসরণ করা অবশ্য কর্তব্য। পর্যায়ক্রমে সর্বপ্রথম উত্তর-পূর্ব, তারপর উত্তর-পশ্চিম , দক্ষিণ-পূর্ব এবং পরিশেষে দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ এইভাবে খনন করা উচিত।

ভিত্তিপ্রস্তর ———-
বাস্তু বিশেষজ্ঞ ও জ্যোতিষীর পরামর্শ অনুযায়ী শুভ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা উচিত। প্রথম খননের ঠিক বিপরীত নিয়মে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে হবে। যথা: পর্যায়ক্রমে দক্ষিণ-পশ্চিম , দক্ষিণ-পূর্ব , উত্তর-পশ্চিম ও পরিশেষে উত্তর-পূর্ব।

সীমানা প্রাচীর ————
বাড়ির চারদিকে সীমানা প্রাচীর হওয়া বাঞ্ছনীয়। সীমানা প্রাচীর এবং মূখ্য বাড়ির মাঝখানে যেন ছাড় থাকে। সীমানা প্রাচীরের পশ্চিম দিকের দেওয়াল পূর্ব দিকের দেওয়ালের চেয়ে যেন বেশি উঁচু থাকে। যদি দক্ষিণ এবং পশ্চিমের দেওয়াল উঁচু করা সম্ভব না হয় তবে যেন দেওয়ালটিকে তুলনামূলকভাবে একটু মোটা করে তৈরি করা হয়।

সীমানা প্রাচীরের দ্বার ———–
সীমানা প্রাচীরের দরজা নির্ভর করছে জমিটি কোন মূখী তার ওপরে। সীমানা প্রাচীরের দরজা কীভাবে তৈরি করতে হবে সে সম্বন্ধেও প্রামাণিক সূত্রগুলি প্রাচীন বাস্তুশাস্ত্রে বলা আছে। নীচে একটি তালিকার সাহায্যে এ বিষয়ে জানানো হল।

1. পূর্বমুখী জমি- উত্তর-পূর্বদিকের পূর্বে করতে হবে।
2. পশ্চিম মুখী জমি – উত্তর-পশ্চিমের পশ্চিম দিকে করতে হবে।
3. উত্তরমূখী জমি- উত্তর-পূর্বের উত্তর দিকে।
4. দক্ষিণমূখী জমি- দক্ষিণ-পূর্বের দক্ষিণ দিকে।

সীমানা প্রাচীরের দরজা যে দিকগুলিতে করা কোনও মতেই উচিত নয় তারও একটি তালিকা দেওয়া হল।
a. দক্ষিণ-পূর্ব দিকের পূর্ব দিকে।
b. দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের পশ্চিম দিকে।
c. উত্তর-পশ্চিম দিকের উত্তর দিকে।
d. দক্ষিণ দিকের মাঝখানে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী গ্যারেজ ———-
গ্যারেজ হওয়া উচিত দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী ব্রহ্মস্থান ———–
জমির মাঝখানে অর্থাৎ একেবারে মধ্যস্থলে কোনও রকমের ভারী নির্মাণ কর্ম বাঞ্ছনীয় নয়। যেমন বিম কলাম, পিলার , দেওয়াল ইত্যাদি যেন জমির মাঝখানে না থাকে। একই রকমভাবে কোনও ঘরের মাঝখানে কোন রকমের ভারী কিছু বসানো বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ মধ্যস্থল হল ব্রহ্মস্থান।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী বারান্দা ———-
উত্তর ও পূর্ব দিকে করতে হবে বারান্দা। বারান্দার ছাদের স্তর বাড়ির ছাদের স্তরের এক সমান যেন না হয়। বারান্দার উত্তর-পশ্চিম দিকে জুতো রাখবার জায়গা করা যেতে পারে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী টেরাস ———-
বাড়ির উত্তর বা পূর্ব অংশে টেরাস নির্মাণ করতে হবে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী নলকূপ ও সেপটিক ট্যাঙ্ক ———
নলকুপ, কুয়ো ইত্যাদি উত্তর-পূর্ব দিকে তৈরি করতে হবে। উত্তর-পূর্ব দিকের কোণসূত্রের উপর যেন নলকুপ বসানো না হয়। সেপটিক ট্যাঙ্ক দক্ষিণ-পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিমে করা যেতে পারে। এটিও যেন কোণসূত্রের উপর না বসে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী পায়খানা ———–
উত্তর বা পশ্চিম দিকে সীমানা প্রাচীরের দেওয়াল স্পর্শ না করে আউটহাউস তৈরি করতে হবে। আউটহাউসের উচ্চতা প্রধান দেওয়ালের উচ্চতার চেয়ে কম হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী খাওয়ার ঘর ———
খাওয়ার ঘরের অবস্থান নির্ভর করছে রান্নাঘরের অবস্থানের উপর। আদর্শ রান্নাঘর হিসাবে যদি দক্ষিণ-পূর্বে রান্নাঘরের অবস্থান হয়, তবে পূর্বদিকে খাওয়ার ঘর করা উচিত। এবং যদি উত্তর-পশ্চিমে রান্নাঘর হয় তবে পশ্চিম দিকে খাওয়ার ঘর করা উচিত। খাওয়ার টেবিল অবশ্যই আয়তাকার হওয়া উচিত। গোল বা ছয় কোণযুক্ত টেবিল না হওয়াই বাঞ্ছণীয়। খাওয়ার ঘরের দক্ষিণ-পূর্বে বা উত্তর-পশ্চিমে রেফ্রিজারেটর রাখা উচিত এবং উত্তর-পূর্বে খাওয়ার জল , জলের ফিল্টার ও বেসিন রাখতে হবে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী বসবার ঘর ———
বাড়ির এবং অতিথিদের বসবার ঘর হবে পূর্ব বা উত্তর-পশ্চিম দিকে। বাড়ির কর্তা পূর্ব বা উত্তর দিকে চেয়ে অতিথিকে আপ্যায়ন করবেন। বসবার জায়গাগুলি এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে অতিথি পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে কথা বলেন এবং বাড়ির কর্তা পশ্চিম বা দক্ষিণ দিকে থাকবেন। এতে বাড়ির কর্তা এবং অতিথি উভয়ের পক্ষে শুভ।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী পড়ার ঘর ——–
উত্তর বা পশ্চিম দিকের ঘরে পড়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। কিন্তু পড়বার সময় অবশ্যই পূর্ব বা উত্তর দিকে তাকিয়ে পড়াশুনা করা উচিত। পড়বার টেবিলের ঢাকা বা টেবিল ক্লথ যদি হালকা সবুজ রঙের হয় তবে পড়াশুনায় মনোনিবেশ করতে সাহায্য করে। মনোবিজ্ঞানীদের তথ্য থেকে এটা প্রমাণিত। পড়ার ঘরের দরজা উত্তর-পূর্ব দিকে হলে ভাল হয়।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী কর্তার শোওয়ার ঘর ———
কর্তার শোওয়ার ঘর হবে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে। কর্তার শোওয়ার খাট থাকবে দেওয়াল থেকে অন্তত তিন ইঞ্চি দূরে। কর্তার শোওয়ার অবস্থা হবে মাথা দক্ষিণ দিকে এবং পা উত্তর দিকে , কোনও মতেই মাথা উত্তর দিকে থাকবে না। তার বিজ্ঞানসম্মত কারণ হচ্ছে মানুষের মাথা দেহের অন্যান্য অংশের চেয়ে ভারী। উত্তর দিকে মাথা রেখে ঘুমোলে নানা রকম রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ হচ্ছে উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরু শরীরের উপর প্রভাব সৃষ্টি করে। ঘরের সংলগ্ন শৌচাগার উত্তর-পশ্চিম অথবা দক্ষিণ-পূর্বে করতে হবে। ওই ঘরের দরজা উত্তর বা পূর্বে রাখা উচিত। প্রধান আলমারি ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম খাটের পাশে এমনভাবে রাখতে হবে যাতে আলমারির মুখ থাকে উত্তর দিকে। ওই আলমারিতে গৃহকর্তা তাঁর মুল্যবান কাগজ ও দলিলপত্র এবং টাকা-পয়সা রাখবেন। কারণ এই উত্তর দিক্‌ই হচ্ছে বুধ গ্রহের দিক্‌ । দক্ষিণ-পশ্চিমে ভারী আলমারি রাখা সম্ভব না হলে কর্তার ঘরের উত্তরে ছোট আলমারিতে টাকা-পয়সা রাখা যেতে পারে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী ছেলের শোওয়ার ঘর
ছেলে যদি বিবাহিত হয় তা হলে তার শোওয়ার ঘরে অবস্থান হবে বাড়ির দক্ষিণ-পূর্বে। এটা যেহেতু আগ্নেয়-কোণ , সেহেতু বিবাহিত জীবনযাপনের পক্ষে সুখকর। ছেলে যদি অবিবাহিত হয় বা ছাত্রাবস্থায় থাকে তা হলে তাকে পূর্বে অথবা উত্তরের ঘরে শোওয়ার ব্যবসথা করে দিতে হবে। বিদ্যার্থীর মাথা পূর্ব , দক্ষিণ দিকে রেখে ঘুমানো শাস্ত্রসম্মত।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী কন্যার শোওয়ার ঘর
কন্যার শোওয়ার ঘর হবে উত্তর-পশ্চিম দিকে কারণ জ্যোতিষ মতে এটি চন্দ্রের স্থান এবং সঙ্গীত ও কলার পক্ষে শুভ।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী কিশোরের শোওয়ার ঘর
কিশোরদের শোওয়ার ঘর হবে পশ্চিম দিকে। শোওয়ার খাটকে ঘরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রাখতে হবে। কিশোরদের মাথা পূর্ব , দক্ষিণ দিকে রেখে শোওয়া চলে। শোওয়ার খাট যেন দেওয়ালকে স্পর্শ না করে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী উপাসনালয়
উপাসনালয় এর অবস্থান বাড়ির উত্তর-পূর্ব দিকে হওয়া অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। এটা জ্যোতিষমতে বৃহস্পতির স্থান এবং বৈজ্ঞানিক মতে এই দিক্‌ ধনাত্মক শক্তির প্রাচুর্যে ভরা। এই কারণে প্রাথনার জন্য এই দিকটি উৎকৃষ্ট স্থান। বিদ্যার্থীরাও এই দিক্‌কার ঘর ব্যবহার করতে পারে এবং যোগব্যায়াম বা সাধনা করার পক্ষে এই দিক্‌ উৎকৃষ্ট। যে সমস্ত মালিকানাযুক্ত ফ্ল্যাট বাড়িতে উত্তর-পূর্ব দিকে নামাজ ঘর নির্মাণ করার উপায় না থাকে তবে সেই সব স্থলে ” ব্রহ্মস্থানে ” ছোট করে উপাসনালয় নির্মাণ করা যেতে পারে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী অতিথিদের ঘর
অতিথিদের থাকার ঘরের অবস্থান হবে বাড়ির উত্তর-পশ্চিম দিকে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী অসুস্থ্যদের ঘর
অসুস্থ্য ব্যক্তির ঘরের অবস্থান উত্তর-পূর্ব দিকে ভাল হয়। এতে সে তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে উঠবে এবং সুস্বাস্থ্য লাভ করবে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী শোকাতুর ঘটনা ঘটলে
মৃত ব্যক্তির জন্য বাড়ির পশ্চিম দিকের ঘর ব্যবসা করতে হবে এবং মৃত ব্যক্তির ক্রিয়াকার্যাদি পশ্চিম দিকে করতে হবে , বিশেষত উঠোনে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী আঁতুড়ঘর
আগেকার দিনে বাড়ির মধ্যেই একটি পৃথক ঘরে শিশুর জন্ম হত। শিশু জন্মের আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট ঘরকে আঁতুড়ঘর ঠিক করে তাতে সন্তানসম্ভবা মহিলাকে রাখা হত। এখনও আমাদের দেশে পল্লি অঞ্চলে বাড়ির আঁতুড়ঘরেই শিশুরা ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে। তবে এই ব্যবস্থা দ্রুত পালটে যাচ্ছে। এখন শহরতলিতেও হাসপাতাল বা নার্সিং হোম অথবা মেটারনিটি হোমে শিশুদের জন্ম হয়। এখনকার ফ্ল্যাটবাড়ির সংস্কৃতিতে পৃথক আঁতুড়ঘর করার কথা ভাবাও অসম্ভব। তবে হাসপাতাল ও নাসিং হোম প্রভৃতির আঁতুড়ঘর উত্তর-পূর্বদিকে হলে মা-শিশু উভয়ের পক্ষেই ভাল। শিশুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার স্থান উত্তর-পূর্ব দিকে হওয়া উচিত। এতে শিশুর জন্ম হয় নির্ঝঞ্ঝাটে। ফ্ল্যাট বা বাড়িতে গর্ভবতী মহিলাদের উত্তর-পূর্ব দিকের ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা ভাল। সন্তানসম্ভবা মায়েদের পক্ষে এ ধরণের ঘরে থাকা সব দিক্‌ থেকে ভাল। যদি কোনও ফ্ল্যাট বা বাড়িতে উত্তর-পূর্ব দিকের ঘরে ব্যবস্থা না হয় তা হলে অন্ততপক্ষে উত্তর-পশ্চিম দিকের কোনও ঘর হলেও চলবে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী বেসমেন্ট
যদি করতে হয়ে তবে বেসমেন্ট উত্তর-পূর্ব দিকে করা যেতে পারে। দক্ষিণ বা পশ্চিম দিকে কোনও মতেই হবে না।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী মেজানাইন ফ্লোর
যদি মেজেনাইন-এর প্রয়োজন হয় তবে তা দক্ষিণ দিকে করা যেতে পারে।

বিবিধ –
প্রত্যেকটি ঘরের মাঝখানে ভারী কোনও কিছু জিনিস রাখা যাবে না। কেবল খাওয়ার ঘরে খাওয়ার টেবিল রাখা যেতে পারে। আলমারি , দেওয়ালের ম্যাট , আলনা ইত্যাদি ভারী জিনিসপত্র ঘরের দক্ষিণ , পশ্চিম অথবা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে রাখতে হবে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী আয়না
আয়না রাখার আদর্শ জায়গা হচ্ছে ঘরের উত্তর বা পূর্ব দেওয়াল।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী ঘড়ি
যে কোনও ঘরের উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম দিকের দেওয়ালে লাগানো যেতে পারে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী ছবি
বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম ঘরের দক্ষিণ দেওয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণটি পূর্বপুরুষের ছবি টাঙানোর সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান। বিকল্পে যে কোনও ঘরের দক্ষিণ দেওয়ালের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে পূর্বপুরুষের ছবি টাঙানো যেতে পারে।

বাস্তু শাস্ত্র অনুযায়ী গৃহপালিত জীবজন্তুর ঘর –
গৃহপালিত জীবজন্তু বাড়িতে রাখা যেতে পারে।
এদের আদর্শ জায়গা হচ্ছে-
a. গরু, ছাগল – ঘরের বাইরে জমির উত্তর-পশ্চিম দিকে রাখা যাবে।
b. কুকুর , বিড়াল- উত্তর-পশ্চিমে সিঁড়ির নীচে বা ঠান্ডা জায়গায়।
c.ছোটপাখি এবং শৌখিন পাখি – উত্তর-পশ্চিমে রাখা যেতে পারে।
d.রঙিন মাছ – বারান্দা বা ঘরের উত্তর-পূর্ব দিকে রাখা যেতে পারে।

এ ছাড়াও বাড়ির দরজা জানালার অবস্থান সহ বাড়ি তৈরির প্রায় সকল নিয়ম কানুন এই বাস্তু শাস্ত্রে বর্ণনা করা আছে ।

বাস্তু শাস্ত্র বিষয় এই লেখাটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে সকলকে শেয়ার করুন। আর বাস্তু শাস্ত্র নিয়ে আরো বিশদ জানতে কমেন্ট করুন।

x